তখন ইন্টারে পড়ি। কোথাও কোনভাবে কোন একটা কবিতার কিছু লাইন মাথায় গেঁথে গেলো। অনেক খুঁজে পেতে জানলাম কবির নাম, “হেলাল হাফিজ”। তার কবিতার বই? সেইবার বই মেলায় খুজে খুজে এ-স্টল ও-স্টল করে কিনে ফেললাম “যে জ্বলে আগুন জ্বলে”।
একেকটা লাইন পড়ি আর মুগ্ধ হই। একেকটা কবিতা পড়ি, আর মুখে গালির তুবড়ি ছোটে। এ আমার বিরাট বদভ্যাস। অতিরিক্ত মুগ্ধতা প্রকাশ করতে গেলে গালাগালির সাহায্য নেই। যাই হোক, আর কি কি বই লিখেছেন কবি? এমন শক্তিমান কবির নিশ্চয়ই আরও বই আছে!
এবার আমার বেকুব হবার পালা।
একটাই কবিতার বই তার, সেই আশির দশকে প্রকাশিত।
ভাবলাম, আয় হায়!! তাহলে কত কম বয়সেই না মরে গেছে বেচারা!! একটা বই ছাপিয়েই… আহারে…
কিন্তু মরলো কিভাবে??
এখন আমার আসল টাসকি খাওয়ার সুচনা। হেলাল হাফিজ কে সবাই চেনেন। কিন্তু তিনি কই আছেন, কেমন আছেন, কেউ জানে না। কেউ না মানে, কেউ না। আমি, আমার কবিতা পাগল বন্ধুরা, মুজাহিদ, আরাফ, তপু, চন্দ্র.. আমাদের সীমিত নেটওয়ার্কে যতটা কুলায়, খুঁজেছি।
কবি জীবিত আছেন নাকি মৃত, এটা জানতেই আমাদের ৩বছর লেগেছিল!!
তারপর, একসময় কবির ফোন নাম্বার পর্যন্ত যোগাড় হলো। অনেক সাহস করে এক ঈদে দিলাম ফোন।
ম্যালা কথা হলো। আমার কোন ভাইবোন নেই শুনে উনি বললেন-
“কে বলেছে? আজ থেকে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে আমার একটা কবি ভাই আছে, হেলাল হাফিজ।”
ঢাকায় ফিরে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন, আমার লেখা শুনতে চেয়েছিলেন, আমিই আর যাইনি তার কাছে।
সেবার বিগতার জন্মদিনে চেয়েছিলাম, দু’জন মিলে দেখা করবো। পুরোনো ঢাকার চক্করে চরকি খেয়ে সেই দিনটাও গেলো।
পরে ফোন হারিয়েছি, নাম্বার হারিয়েছি। আর যোগাযোগ করা হয়ে ওঠে নি।
পরে আবার পুরনো চ্যাট হিস্ট্রী ঘেটে তার নাম্বার বের করেছিলাম। ফোন দিলাম। সেই অনেক আগের ইদের কথা কবির আর মনে নেই। তবু আলতো বকা দিলেন, দেখা না করার জন্যে। রাখার আগে ৩ বার বললেন, “আই লাভ ইউ!”
অনুরক্তের প্রতি এতোটা অসংকোচ আর কেউ কি হতে পারতেন!!!
শুভ জন্মদিন কবি!
আপনাকে দেখেই উপলব্ধি করি আপনার পংক্তিঃ
“কবির জীবন খেয়ে জীবন ধারণ করে, কবিতা, এমন এক পিতৃঘাতী শব্দের শরীর।”
কিংবা
“কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয় “
-জেনেছি আপনার থেকেই, হয়েছিও প্রয়োজনে।
অনেক বিশ্বাস নিয়ে উচ্চারণ করেছিঃ
“আমার দুঃখ আছে কিন্তু আমি দুখী নই,
দুঃখ তো সুখের মতো নীচ নয়, যে আমাকে দুঃখ দেবে।
আমার একেকটি দুঃখ একেকটি দেশলাই কাঠির মতন,
অবয়ব সাজিয়েছে ভয়ঙ্কর সুন্দরের কালো কালো অগ্নিতিলকে,
পাঁজরের নাম করে ওসব সংগোপনে
সাজিয়ে রেখেছি আমি সেফ্টি-ম্যাচের মতো বুকে।”
কবি,
জানিনা কতটা পেরেছেন, কিংবা পারবেন.. তবু..
“এক জীবনের সব হাহাকার বুকে নিয়ে
অভিশাপ তোমাকে দিলাম,
তুমি সুখী হবে, খুব সুখী হবে।”
শুভ জন্মদিন, ঢাকার দেয়ালময় “এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়” শ্লোগানের কবি, হেলাল হাফিজ।