বিশ্বাস করুন, আমি প্রচন্ড আত্মহত্যা প্রবণ একজন মানুষ।
যদিও আজীবন, নিজেকে গোঁড়া জীবনমুখী দাবী করে এসেছি। এবং আমি নিশ্চিত, আমার অধিকাংশ বন্ধু উপরের প্রথম লাইনটা পড়েই হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। অথচ, “মৃত্যুন্মুখ জীবন বিলাসীতা” আমার রোজকার দিনযাপনের স্লোগান ছিলো। বারবার এমন একটা কথার ব্যাবহার কাউকে কখনোই কিন্তু ভাবায় নি। সাদা চোখে, আমি হচ্ছি পৃথিবীর সুখীতম মানুষদের প্রতিনিধি। আমাকে বরং ঈর্ষে করতে ইচ্ছে হয়, তাই না?
অথচ, আমার ভেতরের একটা অংশ মাঝে মাঝেই আমাকে মেরে ফেলতে চায়। সেই চাওয়ার পিছনে কোন কারণ, চাওয়া-পাওয়া, আশা-হতাশা, প্রেম বা ঘৃণা ইত্যাদির লেনদেন থাকে না। সেই চাওয়াটা যদিও কড়া শাসনের মধ্যে বেড়ে উঠছে আমার সাথে সাথে, আমি টের পাই। তাও, বিশ্রী লজ্জ্বার মতো ঢেকে রাখি, যেমন নিতম্বের বিষফোঁড়া ঢেকে রাখে লোকে।
মাঝে মাঝে আমার প্রচন্ড কষ্ট হয়। কেমন কষ্ট? আমি নিজেও ঠিক জানি না। অকারন বিষণ্ণতা যেকোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষকে যে কোন স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক সময়ে ছুঁয়ে যেতেই পারে। আমাকেও যায়। কেবল ছোঁয় না, আষ্ঠে-পৃষ্ঠে চেপে ধরে পারলে জবাই করে ফেলে। তখন, গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করতে ইচ্ছে হয়। ডাঙায় তোলা চিতল মাছের মতো তড়পাতে মনে চায়। মনে হয়, একটা ত্রিশটনী ট্রাকের চাকা যদি বুকের উপর থেকে চলে যেতো, পাজরের হাড় গুলো কি মিষ্টি মটমট শব্দ করে ভাঙতো! আহ, আরাম পেতাম! কিংবা, ঢকঢক করে একগ্লাস কড়া এসিড খেয়ে নিলে, উফ, জিভ থেকে কণ্ঠ, শ্বাসনালী, বুক সব পুড়তে পুড়তে যাচ্ছে! শান্তি!! শান্তি!!
একান্ত কোন দায়বদ্ধতা না থাকলে আমি সে দিনগুলোতে ঘর ছেড়ে বের হতে চাই না। আসলে বিছানা থেকেই নামি না। একদিন-দুইদিন-তিনদিন। কখনো কখনো সপ্তাহ ছাড়িয়ে যায়। আমি খেতে চাই না, ঘুমুতে চাই না, বেরোতে চাই না, খুব জোর জবরদস্তি করে নিজেকে দিয়ে কাজ করাই। নিজেকে টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে আনি, নিজের জন্যেই। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। হারিয়ে যেতে সুখ! নিজেকে আঘাত করতে ইচ্ছে হয়। আঘাতেই আনন্দ!! নিজের অস্তিত্বের সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলতে ইচ্ছে করে। তীব্র জোরালো ইচ্ছে।
হঠাৎ হুশ হয়! যত তাড়াতাড়ি পারি নিজেকে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করি। নিজের বিষন্নতার ব্যকরণ তৈরি করি, নিজের ছক ভাঙি। নিজেকে শেখাই নিজের সাথে যুদ্ধ করতে। নিজের সম্ভাব্য ইস্যুগুলো, যেগুলো আমার অবচেতন মনের যন্ত্রণার কারণ হতে পারে, তার লিস্টি তৈরি করি। তারপর এক এক করে প্রত্যেককে নিয়ে তামাশা বানাই, প্রমাণ করি, তারা আদতে কতো হাস্যকর! খুব খুব কাছের বন্ধুগুলোকে প্যারা দেই। কবিতায় ডুব দেই। ভাবনার মাকড়শারা যে জাল বুনে চলে, তাতে জোর করে রঙের পিচকিরি ছুঁড়ি। আমার চেনা অমানুষিক রকম যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর গল্প শোনাই নিজেকে। নিজের ফেলে আশা দুঃস্বপ্নের রাতগুলো কিভাবে পেরোলো, সে গল্প করি। দাঁড়ি কামাই, গোসল দিই, মধ্যরাতে উঠে ধোয়া জামাকাপড় পরে (যদি আদৌ দুয়েকটা থাকে ঘরে) সেন্ট মখে বসে থাকি। সিটি বাজাই। নিজের খোলস ভাঙি, আমার নরম নাজুক হাতে।
মাঝে মাঝে এসবের জন্যে তীব্র মানসিক শক্তির দরকার হয়। এটা কাউকে বোঝানো যাবে না, যতক্ষণ না সে নিজে এটাকে এক্সপেরিয়েন্স করছে। মাঝে মাঝে আর ইচ্ছে করে না। খুব ক্লান্ত লাগে। আমার লেখাগুলো যদি কেউ তারিখ ধরে পড়তে পারতো, হয়তো ফ্রিকোয়েন্সির আন্দাজটা পেতো। ভয় হয়, যদি সত্যিই কোন দিন লড়াই করার এই ইচ্ছেগুলো সত্যি সত্যি মরে যায়!! ইচ্ছেদেরও যে অসুখ করে, ইচ্ছের অসুখে জীবনের পোকা মরে গেলে?
_________________________________________
গতো ক’টা দিন ধরে পরিচিত মহলে আত্মহত্যার খব পাচ্ছি নিয়মিত। ফেসবুকে, পত্রিকায়, সবখানে। আত্মহত্যা করেছে এমন কিছু মানুষের প্রোফাইলে ঘুরেছি। অনেককেই দেখেছি, তারা দিনের পর দিন আলতো আলতো করে বলে গেছে, সংকেত দিয়ে গেছে। হুট করে কিন্তু কেউ কিছু করে নি।
মনে আছে, ঢাবি-র একটা ছেলে রেললাইনে মাথা রেখে ফেইসবুকে স্টাটাস দিয়েছিলো? হতাশার কাছে তার এই আত্মসমর্পন নিয়ে কতো সেলিব্রেটি কতো টিটকারী করলো! তার টাইমলাইনে গিয়েছিলাম। ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে ছেলেটার প্রতিটা স্ট্যাটাসে ঠিকরে উঠছিলো দমবন্ধ ডিপ্রেসন। আর কমেন্টে ছিলো বন্ধুদের কৌতুক। দুই একটা ভেঙে পড়া স্টাটাসের পর থাকতো তীব্র মোটিভেশনাল কন্টেন্টের লিঙ্ক। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে, লড়তে লড়তে ভেঙে পড়েছে, তবু নিজেকে শেখাতে চেয়েছে। তার সময়গুলো ওই টাইমলাইনে খুব জীবন্ত ছিলো, যা বুঝতে কারো মনোবিজ্ঞানী হবার প্রয়োজন নেই। ছেলেটার একটা হাতের খুব প্রয়োজন ছিলো, একটা মানুষের খুব দরকার ছিলো। কেউ সেখানে ছিলো কি না, আমি জানি না।
আত্মহত্যা প্রবণ মানুষেরা তাদের গোচরে-অগোচরে কিছু সংকেত দিয়ে যান। যেমন, খুব রেকলেস হয়ে ওঠা, ঘুরে ফিরে মৃত্যু নিয়ে কথা বলা, সেলফ হার্মিং বিহেভিয়ার ডেভলপ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এগুলো দেখেও দেখি না, কিংবা আমাদের অজ্ঞতার জন্যে এগুলো টের পাই না, টের পেলেও এড়িয়ে যাই নিষিদ্ধ ট্যাবুর মতন। কিংবা ভাবি, এ নিয়ে কথা বললেই বোধহয় আত্মহত্যার ইচ্ছেকে উসকে দেয়া হবে! আমরা ভুল করি।
______________________________________________
আত্মহত্যা এবং মানসিক সহায়তার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান এখন তৃণমুলে কাজ করছে। একাধিক হেল্পলাইন রয়েছে যেখানে ফোন করে কথা বলা যায়, সাহায্য নেয়া যায়। সম্প্রতি সরকারও এ ধরনের উদ্যোগ নেবার ঘোষণা দিয়েছে। এটা অবশ্যই এপ্রেশিয়েট করার মতো। শহুরে মানুষের চিন্তায় কিছুটা হলেও চেঞ্জ এসেছে। চেঞ্জটা মফস্বলেও দেখছি। কিন্তু যেটা একদমই নেই, বিষন্নতা, আত্মহত্যার প্রবণতা, মানসিক বিবিধ ইস্যু ইত্যাদির সুচিহ্নিত সিম্পটম গুলোর ব্যাপারে গণসচেতনতা, যা এই মুহুর্তে সবচেয়ে জরুরী। বোধকরি, আমাদের প্রজন্ম বা আমাদের ঠিক পরের প্রজন্ম (নিজেকে যদি বুড়ো ঘরানায় ফেলে দিই) খুব জটিল আর বিচ্ছিন্ন মনস্তত্ব নিয়ে বেড়ে উঠছে। একুশ শতকের উপার্জনসর্বস্ব আর্থসামাজিক জীবনকাঠামো মানুষকে বড় একঘরে করে ফেলছে, খুব অপরিচিত এক ট্রানজিসনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ধনতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থার যুগে সবাই টাকার পিছনে ছুটছি, প্রতিষ্ঠার পাবার জন্যে ছুটছি। কারো জন্যে কারো কোন সময় নেই, মায়া নেই, টান নেই। একত্রে অজস্র একা মানুষ যে যার নিজের দেয়ালে চাপা পড়ে আছি। আমাদের সন্তানেরা কিভাবে বেড়ে উঠছে আমরা জানি না। শৈশব নিয়ে তাদের যে স্মৃতি, সেখানে মা-বাবা, পরিবার, স্বজন, বন্ধু কে কোথায় কতোটুকু আছে? সাত বছর একটা কোরিয়ান RPG গেইমের মধ্যে থেকে বড় হওয়া ছেলেটার কাছে হাওর-বাওর-বিল সাঁতরে স্কুল পালিয়ে বাঁদরামো করে বেড়ে ওঠা ছেলেটার মনস্তত্ব খুঁজতে চাওয়া আহম্মকি ছাড়া আর কি?
আমার নিজের কথাই যদি বলি। আমার নিজেরই তো কোন পারিবারিক জীবন নেই! গতো ১১টা বছর ধরে আমার নিজের ঘরে আমি অতিথির মতো যাই বছরে দুয়েকবার। আমার বাবা-মা’র সাথে আমার দুরত্ব বাড়ছে প্রতিদিন। অথচ, তারা ছাড়া আমার আপন কেউ নেই, এবং ভাইস-ভার্সা। এই গল্প আজকের অধিকাংশ মানুষের। নগরমুখী জীবন আর উচ্চাকাঙ্খা আমাদের ছিবড়ে ফেলছে আমাদের অজান্তেই। আমরা রোজ স্বার্থপর, অ-স্পর্শকাতর, নিস্পৃহ হতে হতে, যন্ত্র, পাথর আর শীতল ইস্পাত হতে হতে নিজেদের সংস্পর্শে নিজেরাই আহত হই। ইদানিং মা তাই সন্তানকে জবাই করেন, সন্তান বাবাকে হত্যার প্ল্যান আটে। জীবনের আখ্যান কবিতায় তুলে আনা মেয়েটাও শিরোনাম হয় আত্মহত্যার সংবাদে।
কথায় কথা বাড়ে, ফলন আসে না।
_______________________________________
যাহোক, অনেকতো বকলাম। কথায় কথা পেচিয়ে দিক হারিয়ে থুবড়ে পড়ার আগে একটা জিনিস শেয়ার করে যাই।
বিষাদ, হতাশা, একাকীত্ব, মানসিক চাপ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা, তাদের মানসিক সমর্থন জোগানো এসমস্ত নিয়ে কাজ করছে কান পেতে রই। একা একা না পুড়ে, না মরে, যে কেউ চাইলেই এখানে ফোন করতে পারেন।
সপ্তাহের যে কোন দিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত আর কেবল বৃহস্পতিবার ,এক্সট্রা খাতির, রাত ৩টা পর্যন্ত, নিচের নম্বর গুলোতেঃ
গ্রামীনফোনঃ ০১৭৭৯৫৫৪৩৯১, ০১৭৭৯৫৫৪৩৯২
এয়ারটেলঃ ০১৬৮৮৭০৯৯৬৫, ০১৬৮৮৭০৯৯৬৬
বাংলালিংকঃ ০১৯৮৫২৭৫২৮৬
রবিঃ ০১৮৫২০৩৫৬৩৪
টেলিটকঃ ০১৫১৭৯৬৯১৫০
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক!