ইদানীং কি জানি হয়েছে, খুব করে মরে যেতে ইচ্ছে করে! ইচ্ছে করে হেরে যেতে, বিনাশর্ত আত্মসমর্পনের নামে নিজেকে ডুবিয়ে দিতে টুপটাপ চোরাস্রোতে। অথচ, কি অহম-ই না ছিলো আমার “জীবন” উচ্চারণে। অহমের প্লেগে নয়, ক্যান্সারেই বরং ধুকছে সময়। না-হারা মনও, মনে মনে ভাবে- ধুরো, হেরে গেলে কি হয়! ল্যাঠা চুকে যেতো! তবুও গুছিয়ে নেই নোংরা মলাটে বাধা এলোমেলো কাগজের খাতা। “তোমার দৌড় তো আর দৌড়ে দেবে না কেউ”, নিজেকেই বলি। কিছু খুব একান্ত যন্ত্রণা থাকে, চাইলেও বাটোয়ারা চলেনা কোন।
দিনশেষে দ্যাখো, না তোমার পথে ছাপ আছে আর কারো পা’র… না কেউ তোমার ক্লান্তি জড়িয়ে রেখেছে গায় খুব শীতে চাদরের মতো। অন্ধকার, সত্যের মতো দ্যুতি দ্যায়। কখনো, ভীষণ সকালও মাঝরাত্রি বনে যায়। সাময়িক ক্লান্তির কাছে হেরে যায় না-হারা দিনের কাহন।
কি আসে যায়, কতোটা লড়েছো পিছে, আজকের যুদ্ধে গতকালের আহত শরীর টেনে ক্ষমা চাও! হাস্যকর!
আমি যা কিংবা যা যা হতে চেয়েছি, তার কিছুই হতে পারি নি। আমার এই ব্যর্থতার পিছনে সবচে বড় দায় আমার ভয়ের। খুব ভীতু মানুষ আমি। রক্তে মিশে থাকা বাউন্ডুলেপনার বিপরীতে এই ভয়, সম্মান, সমাজ, পরিবার, দায়িত্ব এসবের ভয় আর দ্বিধা নিয়ে, না আমি সেই নীললোহিত হতে পেরেছি, না হতে পেরেছি কোন গৃহপালিত আধ-সুখী মানুষ। এ দুয়ের দোটানায় দুটুকরো হয়ে গুলশান বনানীর কর্পোরেট হাউসগুলোতে সাপোর্ট দিয়ে বেড়িয়েছি আমি পাতি নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার। অথচ কর্পোরেট কালচার আমার আত্মস্থ হয় না, বিজনেসের পলিসি মাথায় আঁটে না। কখনো বসকে অপ্রস্তুত করে ফেলি, কখনো নিজে বিব্রত হই। তারপর সব ছেড়ে ছুড়ে দস্তুরমতো ম্যানেজার হয়ে বসলাম, ফুল ফ্লেজেড একাউন্ট্যান্ট! আয়নাতে নিজেকে দেখেই আঁতকে উঠি!!
অথচ, অর্জনের পথে যে ঝুঁকিটা অনিবার্য, তাকে ভয় পেলে এভাবেই ঝুলে ঝুলে কেটে যাবে বাকিটা জীবন।
স্থিত জীবনের লোভ বড় খারাপ। শীতাতপ কামরাগুলোতে সফল মানুষগুলোর সারাবেলা কাটানো দেখে, মায়া লাগে। আবার নিজের জন্যেই নিজের করুণা হয়।
“একদিন দিন যাবে, মৌসুম ফুরাবে” বিরবির করতে থাকি।
এভাবেই দিন পার হচ্ছে, সকাল আসছে! অফিসপাড়ার লেন উপচে যাচ্ছে। সকালের অভিব্যক্তিহীন মানুষগুলো, যন্ত্র নাকি জোকারের মতো, ছুটছে আর ছুটছে। মোহাচ্ছন্নের মতো ছেলে থেকে বুড়ো, অষ্টাদশী থেকে মাঝবয়েসীনী, পরিচ্ছন্ন পরিপাটি প্রত্যেকে, কেমন হনহন করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। আচানক অজস্র ক্লাউন বুঝি পথে নেমে এলো। কেউ কাউকে চেনে না, কারো প্রতি কারো কোন ভ্রূক্ষেপ নেই।
যেন কোন কালোজাদুর মন্ত্রবলে অন্ধ এ মানুষগুলো। বান কেটে দিলেই সবাই দাঁড়িয়ে যাবে, কে কোথায় কোত্থেকে এলো, মনেই করতে পারবে না।
বাপের হোটেলে খেয়ে খেয়ে অবশ্য এরকম ভাবাই যায়। মুক্ত স্বাধীন জীবন চায় না, কে আছে? তবু প্রত্যেকেই মিমিক জীবন বেছে নেয়। ও দলে আমিও ভীড়ে যাচ্ছি, প্রত্যেকটা দিন।
তবে কি, এই অদ্ভুত সুন্দর আর আশ্চর্য মানবজন্মটা কেবলমাত্র জীবিকার পিছনে খরচা করতে বড় বাধে। বড় দুঃখ হয়!
আহা দুঃখ!
দুঃখ অমূল্য, উলুবনে বিলোতে নেই। এ তোমার একান্ত সম্পদ।
দুঃখের ভাগ কাকেই বা দেবে? এ জিনিস প্রত্যেকেরই আছে, তাও যথেষ্টর চেয়ে বেশি।
বরং প্রকারন্তে, উজ্জ্বল আনন্দগুলো মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দাও। না হয়, কেউ তোমাকে হিংসে করলো, কেউ তোমার সুখের আভা মাখলো চটুল আড্ডায়.. তবু, কেউ তোমায় করুণা করবে না। মায়া মায়া চোখ করে কেউ বলবে না, “আহা বেচারা”।
তুমি যোদ্ধা হও। তোমার ট্রাজেডী কোনদিন যদি উপাখ্যান হয়ও, হোক আরো শতবর্ষ পরে।
বিষন্নতা তুলিতে রাখো, ঠোঁটে নয়।
তুমি যা চাইবে, যেভাবে চাইবে, জীবন কখনই সে মতে এগোবে না। জীবনে কিছুই ঠিক “পারফেক্ট” পাবে না। জীবনের অধিকাংশ পারফেক্ট ব্যাপারই আদতে কৃত্রিম। অবশ্যই পৃথিবীতে ব্যতিক্রম আছে, অতিসৌভাগ্যবান মানুষও আছে। তবু, সত্যি বলতে কখনোই তুমি কোন “কমপ্লিট প্যাকেজ” পাবে না। তাই, তোমার একটা মানুষ-জন্ম সুখী হতে কি কি প্রয়োজন, ভেবে নাও। মৌলিক অনুভুতিগুলোকে অবহেলা করো না। জানো তো, খাওয়া বা পাওয়া, বেশী হয়ে গেলে আবার বদহজম হয়। কিছুটা অপুর্ণতা, স্বাস্থ্যকর তাই। বিশ্বাস করো তুমি সুখী আর নিজেকে ঠকিও না। হয়তো কষ্ট কিছু পাবে, কিন্তু, দিন শেষে হাসতে পারবে দেখো।
জীবন অনেকটা ব্যুফে ডিনারের মতো। তুমি যদি খরচ উসুলের নেশায় গোগ্রাসে গিলতেই থাকো, হয়তো পয়সাটা উসুল হবে। অথচ দ্যাখো, একটা খাবারের স্বাদও তুমি ঠিকঠাক নিতে পারছো না। তুমি অনেক খাচ্ছো, সবই খাচ্ছো, কিন্তু তৃপ্তি করে খেতে পারছোনা।
জীবনের থেকে সবই যদি পেতে চাও, হয়তো অনেক কিছুই পাবে। পেতে পেতে হয়তো একদিন হঠাৎ চমকে উঠবে, জীবনে সবই তো হলো। “বাঁচা”টাই হলো না কেবল।
জীবন একটা ছারপোকা, যার কুটকুট করে কামড়ানো ছাড়া বিশেষ কোন কাজ নেই।
জীবন কুট কুট করে কামড়ে চলে, আমরা ফুটফুট করে বেঁচে থাকি।
ইচ্ছের অসুখে জীবনের পোকা মরে গেলে, আমরাও মরে যেতে চাই।
ইচ্ছেরা পোকার আবাদ করে, কিলবিল কিলবিল জীবনের ছারপোকা!!
ছারপোকা ভর্তি স্বপ্নের বারোয়ারী তোশক।
কি সুন্দর! আমরা বেঁচে থাকি!