রুবাইদ মেহেদী

নিজেকে যায় না চেনা, আয়নার মিথ্যে শ্লোগানে...

রুবাইদ মেহেদী

অবেলার অণু-সংসার

Uncategorized
দৈনন্দিন

 

না জীবন আমাকে কখনো সারপ্রাইজ দিতে হতাশ করেছে, না আমি জীবনকে। উহু, খুব আহামরি কিছু একটা গল্প আমার নেই, যেখান থেকে এমন রগরগে ডায়লগবাজি করা চলে। আমার তবু একটা ভীষণ খটমটে গল্পের খাতা আছে।

আমার ছোটবেলাটা  ছিলো সাদামাটা। নাহ, বেশতো রঙিন! আমার প্রথম স্কুলে যাবার যে গল্প, সেটাও অন্যরকম। আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া গেলো, আমি এলাকার প্রাইমারী স্কুলে ক্লাস করছি গিয়ে। মণিরুলের সাথে চলে গিয়েছিলাম, ও আমার খেলার সাথী ছিলো। তারপর দিনে দিনে কতো দিন গেলো, বেড়ে উঠলাম। দিনের সাথে পাল্লা দিয়ে আমার গল্পরাও বেড়ে উঠলো।

তখন ভার্সিটিতে পড়ি। আমার ২২তম জন্মদিনের মাস খানেক পরের কথা। হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়েছি ক’দিন হলো। মা একদিন বললো, সে জায়নামাজে ঢের কেঁদেছে। আমার জীবনে যা কিছুই হচ্ছে, তবু আমার সংসার জীবনটা  যেন খুব সুখের হয়, এমন প্রার্থনায়।

আমার জীবনে কি এমন গিয়েছে!! কিছুই না। এর চে’ ঢের যন্ত্রণা নিয়ে মানুষ দাপায়, এর চেয়ে ঢের প্রতিবন্ধকতাকে কাতুকুতু দিয়ে মানুষ ওড়ে। তবু, কাঁচা ক্ষতে ওটুকু কথার প্রলেপ কি জানি লোভ দেখিয়েছিলো। আমি লোভে পড়ে গেলাম।

তারপর দিন গেছে দিনের মতোন, আমিও আমার মতো করে স্বপ্ন দেখেছি। নিজেকে বেধড়ক তক্তাপেটা করে হলেও টিকিয়ে রেখেছি। আমি ভালো থেকেছি, আমি ভালো বেসেছি। আমার সময়গুলো রঙিন ছিলো।

ছিলো বলতে এমন নয় যে, এখন আর নেই। যেটা আমি প্রায়ই বলি, ক্ষরণের রঙ কখনো সাদা কালো হয় না।

মা’র প্রার্থণা বোধকরি মঞ্জুর হয়েছে। আমার সংসার হচ্ছে। আমার সংসার বেড়ে উঠছে। আমার স্বপ্নগুলো আমার মতো করে হয়তো সত্যি হচ্ছে না। কিন্তু, জীবন জানে, আমি কতোটা ভালো ছাত্র, কতো দ্রুত সব কিছু শিখে নিতে পারি।

প্রায় বারোটা বছর কাটিয়েছি হোস্টেলে, মেসে। সেই কলেজে ওঠার পর থেকে। সেই নির্ভরশীলতার আস্তরণ ধীরে ধীরে খুলে নিতে শিখছি এখন। খুব বেশি নয়, একটা মাস, আমার সংসারের বয়স।

আমার অণু-সংসার। আমি তার একমাত্র সদস্য। মা আসেন অতিথি হয়ে, কিছুদিন থেকে যান। বাসা ব্যাপারটা আমার কাছে আগে ছিলো রাতে ঘুমোনোর যায়গা। অনেক ঢের দিন গিয়েছে, ব্যাগের মধ্যে টুথব্রাশ থেকে শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক ছিলো, যেখানে রাত, সেখানেই কাত হতে প্রয়োজনীয় মৌলিক রসদ ব্যাকপ্যাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম।

এখন ঘরকুনো হতে শিখছি।

সকালে উঠেই একটা গোসল, তবে নাস্তায় অনভ্যেস। তারপর অফিস।  অফিস শেষে কিঞ্চিত আড্ডা, খ্যাপে ক্লাস নিতে যাওয়া, ক্লাস করা। ফিরে এসে রান্নাঘর। সুবিধে হয়েছে, যে খালা আমায় গৃহস্থালীতে সহায়তা করেন, তিনি বেশ ভালো। একদিনের পর ৩ দিন না এলেও, মোটামুটি, যথেষ্ট মরিচ-পিয়াজ কুঁচি, বাটা মসলা ইত্যাদির মজুদ রাখেন ফ্রীজে। মাসের বেতনটা ঢুকলে এত্তোগুলো সদাই কিনি। মোটা মোটা চকলেটের বার দিয়ে ভরে ফেলি ফ্রীজের এক পাশ, সাথে একটা দুটো জুসের প্যাক, এটা ওটা। তরিতরকারি, কিছু মাছ বা মাংস, এও থাকে।

রান্নার ব্যাপারটা যেহেতু উপভোগ করি এবং অধিকাংশ দিনই যেহেতু কাটাকুটির হাঙ্গামা থাকে না, বাড়ি ফেরার পরে আমার সময়টা মন্দ কাটে না। র‍্যানডম কোন গান বাজতে থাকে স্পিকারে, আমি হাতা গুটিয়ে চুলোর আঁচ বাড়া-কমা করি। কখনো হেডফোনে কথা বলি মুন্না বা মোজোর সাথে, কখনো “সুখ” এর সাথে।

সুখ আমার একা ঘরের লক্ষীমন্ত বন্ধুটি। সুখ ছিলো উপহার,কিন্তু সে যে আশীর্বাদ হয়ে যাবে, বুঝিনি। ওকে পাপেট যদি বলে কেউ, আমার রাগ হয়। ওর সাথে কথা বলতে বোর লাগে না কখনো। এবং, আমি বিশ্বাস করি, ও ঠিক আমার মতোই বুদ্ধিমান। তাই, ইন্টালেকচুয়াল ইনকম্পিটিবিলিটির সুযোগই নেই।

যতোই অগোছালে হই না কেন, রান্না ঘরে আমি বেশ পরিপাটি। এক হাতে রান্না নামতে নামতে অন্য হাতে সমস্ত ধোয়াধুয়ি শেষ হয়ে যায়। এই যেমন আজ রাতে মেন্যু ছিলো গরুর মাংস, এক টুকরা ইলিশ, ধোয়া ওঠা গরম ভাত। কোক ছিলো, ছিলো টমেটোর সালাদ। রেঁধে, খেয়ে হাত ধুতে ধুতেই সমস্ত বাসন ধোয়া হয়ে গেলো, চুলায় চায়ের পানি। ঘন্টাদেড়েক সময় নিয়েছি মাঝে।

এই স্বনির্ভরতার তৃপ্তির আর জোড় হয় না। আমি কারো মুখাপেক্ষী থাকছি না, থাকবো না। এই যে আনন্দ, নিয়মিত মানুষেরা তার কতোখানি বুঝবে, কে জানে!

এখন বই কেনা হয় প্রচুর। আমার টেবিলের উপর সারি সারি বইয়ের শহর। বইয়ের চেয়ে সুখকর সঙ্গী মেলা ভার। একটা ভালো বই জাবর কেটে কেটে অনেকগুলো নিঃসঙ্গ রাতে বর্ণালী মেখে নেয়া যায়। আমি কবিতার পাতা উল্টাই, আমার রাতেরা কবিতা হয়ে ওঠে।

আমার প্রতিটা দৌড় আমি দৌড়াই। সকালে নিজেকে গোসল করাই,  নিজেকে সাইকেল চালিয়ে নিয়ে যাই নিজের গন্তব্যে, নিজের কাজ করি, নিজের উপার্জনে নিজের ইচ্ছেমতোন বিড়ি ফুঁকি, সাইকেলের ছোটখাতো ইস্যুও নিজেই সারাই করি, নিজের ঘরে নিজে নিজের রান্না করি, নিজে খাই, নিজেকে খাওয়াই। নিজের সাথে কথা বলি, শলা করি।

বোধকরি, একটা দীর্ঘ একা জীবনের জন্যে প্রস্তুতির শুরুটা একেবারে মন্দ হচ্ছে না। বলা যেতে পারে আমি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি, বা হয়তো, একটা সময়ে গিয়ে তাই-ই হবো। কি আসে যায় তাতে? জীবন যখন আমার স্বপ্ন গুলোকে বোবা-কানা ছাটাই করে গেছে, তখন আমার আঙুলও কাঁচি তুলতে এক রত্তি কাঁপেনি।

আমি, আমার নিজেকে ছেঁটেছি। মহীরুহ হয়তো আর হতে পারবো না, আমার কাঁধে বুকে সন্ধ্যে সকালে থাকবেনা কিচিরমিচির, রাতে-ভোরে শীতের শিশির। তবু আমি বনসাই, অপরূপ।

মা’র প্রার্থনা ঠিকই ফলে গেছে। আমার সংসার, অনু-সংসার, অদ্ভুত সুখের, আনন্দের।

মা, ভালোবাসা তোমাকে।

 

পুনশ্চঃ

 

 

রাতের খাবার। আর, তারপর…

চা, এ ছাড়া কি জমে! 

 

 


 

 

 

 

 

Facebook Comments