তখন সময়টা ছিলো অ-সময়ের স্পর্শ থেকে অনেক অনেক দূরে।
খুব জোড় ক্লাস ওয়ানে পড়ি। বাসা ছিলো যশোরের মণিরামপুর, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভিতরে। আর স্কুলটা বাজারের মধ্যে, বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূর। যাতায়াত, ভ্যান গাড়ি তে।
ভ্যানগাড়ি আমার কাছে সহজ আর স্বাভাবিক ছিলো। ওদেশে এখনো রিকশার চল পৌঁছেনি। কখনো শহুরে মানুষেরা ভ্যানে চড়তে বিব্রত হলে, আমি কারণটা ঠিক বুঝতে পারতাম না। বাবার হাত ধরে বাজারে গেলে, ফিরতে যদি সন্ধ্যে হয়ে যেতো, টিমটিমে হারিকেন ঝুলানো ভ্যানে চড়ে বাসায় ফিরতাম। সে বয়সের আমায় কেউ ডানপাশে বসতে দিতো না, এ ছিলো বড় ক্ষোভ আর আক্ষেপের ব্যাপার।
সে কালে নিয়ম করে লোডশেডিং হতো। সলতে নামিয়ে দেয়া হারিকেন থাকতো টেবিলের ধারেই। চিমনির গায়ে ভাঁজ করে কাগজ আটকে দিতাম, যেন আলো চোখে না পড়ে। গুনগুন করে কি না কি পড়তাম, কে জানে! জোরে পড়া ছিলো সে কালের রেওয়াজ। হারিকেনের চিমনিতে সেই কাগজ দিনে দিনে পোড় খেয়ে কালচে হয়ে যেতো, ছুঁলেই ঝরে যেতো এক পরতা।
জানিনে, কেন জানি আজকাল লোডশেডিং এর রাত আর হারিকেনের চিমনির আঁচ খুব মনে পড়ে যায়।
বাজারটা ছাড়ালেই উপজেলার অফিস পাড়া, যেখানে ইদানিং ফায়ার সার্ভিসটা হয়েছে, সেখান থেকেই একদম ফাঁকা রাস্তা। তখনো ছিলো, এখনো আছে। রাস্তার দু’ধারে আকাশ ঢেকে ফেলা বিরাট বিরাট গাছের সারি। সে গাছেদের নাম-জাত এখনো জানি নে। উপজেলার মধ্যে ছিলো কার্ডফোনের বুথ! সেইই কার্ডফোন! কি আশ্চর্য বাক্সঘর! দোকান থেকে কিনে আনা কার্ড পুরে কতো কথা বলা যেতো, আর কথা মেপে মেপে কার্ডের কালো ফিতেয় দাগ বসে যেতো। ধাতব টেলিফোনের কার্ড গেলার খেলা হা করে দেখতাম, বাবার আঙুল ধরে।
তারপর ছিলো কতগুলো স’মিল, কিছু দোকানপাট, ফাঁকা রাস্তা। তারপরেই বাম হাতে রহস্যময় ডিজিপিএস বিকন স্টেশনের ত্রিভুজ লেক আর ইয়া লম্বা আকাশ ফুড়ে ফেলা অনেকগুলো টাওয়ার। খুব ছোট্ট সীমানা পাচিলে মোড়ানো কুনিটা দেখলে মনে হতো বুলেট ট্রেনের মাথা। ডানপাশে ছিলো গার্লস স্কুল, মহিলা কলেজ।
তারপর একটা রাস্তা বামে চলে গেলো মোহনপুরে। মোহনপুর কি, আমি জানিনে। সে বয়সে অচিনপুর টাইপ কিছু একটা ভাবতে চাইতাম। রাস্তার মুখে ছিলো বট গাছ, তার নিচে আনিস ভাইয়ের চেম্বার।
আনিস ভাই হোমিওপ্যাথির ডাক্তার। চেম্বারের সামনেই একদিন ব্যালেন্স হারিয়ে সাইকেল সমেত একটা ট্রাকের পাশে পড়ে গেলেন। কেবল মাথাটা চলে গিয়েছিলো চাকার তলায়। মগজটা নাকি ক’হাত দূরে ছিটকে গিয়ে ধুলোর মধ্যে পড়ে ছিলো। পরে শুনেছি, সেই ড্রাইভারও তার পরিচিত সুজন ছিলেন। ঠিক আগের বিকেলেই ওই বটতলাতেই দু’জন আড্ডা দিয়েছিলেন, চা খেতে খেতে।
তারপর আরেকটু এগিয়ে বা হাতে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ। দুরপাল্লার কল করতে বাবা যেতেন প্রায়ই। আমি যেতাম আঙুল ধরে ধরে। অদ্ভুত সব বড় বড় বাক্সের মধ্যে কেমন বড় বড় জ্যাক সেঁধিয়ে থাকতো। অপারেটররা সেগুলো একটা থেকে বের করে আরেকটাতে পুরে দিতেন।যথারীতি, আমি হা করে দেখতাম!
এক্সচেঞ্জটা পেরিয়ে আরেকটু এলে পল্লী বিদ্যুতের অফিস, কর্মরতদের কোয়ার্টার। ওর মধ্যে থাকতো আশিক, অনিক আর লিয়া। আশিক আমার সবচেয়ে বেস্টেস্ট বন্ধু ছিলো, ওর ছোট ভাই অনিক, আমার মিতা। নিচের তলায় থাকতো লিয়া’রা।
মণিরামপুরে আমার শেষ জন্মদিনটায়, আমার ভাসা ভাসা মনে পড়ে, একটা খোলা পিকাপের ছাদে আমরা ছিলাম, আমাদের হাতে ছিলো সুতোয় বাঁধা রঙিন বেলুন।
আশিক কে আর কোনদিনও খুঁজে পাই নি। অনিক বা লিয়াকেও না।
পল্লীবিদ্যুতের উল্টোপাশেই দিপদের বাসা।
দিপা কক্ষণো মেয়ে হতে চায় নি। ছেলেদের মতোন জামা পরতো, নামটা দিপ বলতো। সবাই, বিশেষ করে স্কুলে, ওকে ছেলে বলেই জানতো। একবার ক্ষেপে গিয়ে কি আক্কেলে জানি টিফিন পিরিয়ডে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়েছিলাম, দিপ মেয়ে! দিপ মেয়ে!
দিপ! মাফ করে দিস 🙁
এরপর, ব্রাকের অফিসটা ফেলে একটু এগুলেই থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তারপর বাধাঘাটা সেতু। সেতুর আগে উল্টোপাশে ছিলো একটা প্রাইমারী স্কুল। বাসার ছাদ থেকে দাঁড়ালে ঝাঁকড়া আমবাগানের পাশে টিএইচও-র বাসার উপর দিয়ে দেখা যেতো স্কুলের মাঠ।
আমার প্রথম ঘরপালানি ছিলো সেই স্কুলে।
আমার প্রথম আমকুড়ুনি ছিলো সেই আমবাগানে।
আমার সাদামাটা শৈশব, ওই মফস্বলে, ওই পাঁচিল ঘেরা আমবাগানওয়ালা কম্পাউন্ডে।
Facebook Comments