একটা খুব ছোট্ট পরিবারের গল্প।
পরিবারে মানুষ তিনজন।
মা-টা, বাবাটা, আর একটা মাত্র ছেলে।
পড়াশুনা বা লেখাপড়া, এইসব “ইত্যাদি”র জন্যে ছেলেটাকে থাকতে হয় অনেক দুরের রাজধানীতে। বাসায় ফিরতে পারে বছরে ক’বার তার ঠিক নেই। তার ঘোরার নেশাও ভীষণ। কখনো শীত বা গ্রীষ্মের ছুটি ট্যুর মেরে কাটিয়ে দিলে দুই ঈদের ছুটিই শুধু ভরসা থাকে।
বাবাটা আর মা-টা, দুজনেই চাকুরীজীবী। এই দুর্মুল্যের বাজারে, হোক সন্তান একটাই, খরচের তো বালাই নেই। খেটেমুটে দুজনার যা কামাই, ঐ একটাই ছেলের পিছে।
দুজনের বর্তমান কর্মস্থলের ফারাক ৪২ কিলোমিটার। ছ’মাস আগেও বাবাটা মোটামুটি যাওয়া আসার উপর থাকতো। সকালে চলে যেতো আর সন্ধ্যায় ফিরতো। রোজ ৪২কিমি যাওয়া আসা। চলছিলো ভালোই, ঝামেলা বাঁধলো হার্টে একটা ছোট্ট অ্যাটাক হয়ে। ৩টা রিং এখন তার বুড়ো বুকের মধ্যে। এটুকুই যদি সব হতো, একটা কথা ছিলো। তার কিডনী জোড়া ক্রমশঃ ঝিমিয়ে পড়ছে প্রত্যেকদিন, আছে ডায়বেটিস, হাইপারটেনশন কত কি! প্রোটিন মেপে খেতে হয়, সব্জি সেদ্ধ করে জল ফেলে দিয়ে তবেই তার জন্যে রাঁধো। ক্রিয়েটিনিন মাপে নিয়ম করে, বেড়ে গেলেই যেটুক নার্ভাস হয়ে যায়, সেটাও নিয়মিত। মা-টারও ডায়বেটিস, প্রেশার আছে , কিন্তু ততটা না। বেশী পরিশ্রম করতে পারে না। এই যেটুকু বেঁচে আছে, সেটাই যে কত্তবড় চমক, নিজেই ঠাউরে কুল পায় না। এই বেঁচে থাকা, সে আরেক লম্বা গল্প। তবে যাই হোক, দু’জনেই মুঠো ভরে ভরে অষুধ খান, খেতে হয়। দুজনেই ঘুরে বেড়ান সাথে করে ওষুধের বড় বাক্স নিয়ে।
ওষুধের বাক্স ছেলেটারও আছে। তারে আছে গালভরা নামের বিরল বিদঘুটে বাজে অসুখ। তারও আছে ভয়, ঝুঁকি, দুশ্চিন্তা।ছেলেটার বাক্স তবু ছেলেটার খাটের নিচে ধুলো মেখে পড়ে থাকে। ছেলেটার বয়েস কম, শর্ত মেনে বাঁচার অনীহা এখনো কাটাতে পারেনি।
এখন আর হার্টে রিং নিয়ে দুর্বল কিডনীর বুড়ো বাবাটা রোজ রোজ ৪২কিলোমিটার আসি-যাই করতে পারে না। ছোট্ট একটা বাসা করেছে অফিসের কাছে। এখন তারা ৩টা মানুষ, ৩টা বাসায় থাকে। ছেলেটা ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে বাবার বাসায় যায়, মা-টাও যায়। তারা একসাথে আবার মা-টার বাসায় আসে, তারপর ছুটি ফুরালে সবাই ফিরে যায় যার যার বাসায়। মা-টার বাসাই হলো ওদের সেন্ট্রাল বাসা। ওখানে ফ্রীজ আছে, ফ্রীজে মাছ-মাংস, কত কি জমে থাকে, দিনের পর দিন, মা-টা রাঁধে না, বাবাটারও কেনা থেমে যায়। কি হবে, বাবাটার প্রোটিন গ্রহণ সীমীত। ২০ কি ৩০ গ্রাম রোজ। মা-টা শুধু নিজের জন্যে রাঁধতে চায় না। ছেলেটা এক সপ্তা’র জন্যে বাড়ি এলে, মা-টা হিসেব করে- কাতলা আছে, ভেটকী আছে, বেলে মাছ আর ফাইস্যাও আছে, ছেলেটা আবার বান মাছ খুব খায়, একটা শালবাইনও রাখা আছে, বাগদা আছে, গরুর মাথা আছে, “তোর অমুক মামা একটা তমুক হাঁস দিয়ে গেসিলো, রেখে দিসি”, ছেলেটাকে বলে। “দেশী মোরগ আছে, বাগদা, গলদা আছে, সোলা চিংড়ীও ক’টা দিয়ে গেছিলো কে জানি। কি খাবি বল?? কি খাবি??”
ছেলেটা নির্বিকার, তার একটা কিছু হলেই হয়।
মা এটা রাঁধে, ওটা রাঁধে। রান্না থেকে ফ্রীজের অনেক দিনের পুরোনো গন্ধটা কাটেনা। ছেলেটা টের পায়, কিছু বলে না। খুব করে খায়। মা’টা বলে- ‘খিচুড়ি খাবি? খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করেছিলো অনেক দিন আগে। রান্না করা হয় নি। তুই আসলে রাঁধবো ভেবেছি।” ছেলেটা ক্ষেপে ওঠে। আবার মুহুর্তেই মিইয়ে যায়। খিচুড়ী রান্না হয়, পোলাওয়ের চালে, সাথে বেগুন ভাজি, ডিম ভূনা, মাংস। ছেলেটা বেলা করে ওঠে। বুঝতে পারেনা তার কতখানি খুশী হওয়া উচিত বা কতটুকু দুঃখ নেয়া উচিত। তার খুব ভার লাগে বুকটা। তার ভিজে উঠতে চায় চোখ। ছেলেটা বেরিয়ে পড়ে। ছোটবেলার বন্ধুর দোকানের পিছে গোপনে সিগ্রেট ধরায়। পুরোনো চেনা মুখগুলোর সাথে আড্ডা মারে।
ছুটিরও ছুটি হয়ে আসে। ছেলেটা গুছিয়ে নেয়। ফের ফিরে যায়।
বাবাটার প্রোটিন বাঁধা। হাড়ে বয়সের ঘুন। অফিসের ছোট্ট কামরায় বেলা চলে যায়। মা-টাই এখন আসা-যাওয়া করে, রোজ নয়, সপ্তায় ২-৩বার, সেই ৪২ কিলোমিটার।
ছেলেটা শহুরে ধুলোয় হাঁচি দেয়। পড়াশুনা শেষ প্রায়, চাকুরীর বাজারে আঁচ আন্দাজ করে ঘামতে থাকে।
বাবাটারও স্বপ্ন ছিলো, মা-টারও স্বপ্ন ছিলো। ছেলেটারও স্বপ্ন আছে।
মানুষের একটা মাত্র জীবন, মা-টারও, বাবাটারও, ছেলেটারও।
ছেলেটা ভাবে, ছেলেটা ভয় পায়, ছেলেটা চমকায়, থমকায়।
জীবন এগোতে থাকে।
ছেলেটার আবার ছুটি হবে,
মা-টাও আবার খিচুড়ি রাঁধবে, পোলাওয়ের চালে।
বাবাটাও মাছের বাজারে ঢু দেবে ম্যালাদিন পর।
ছুটি হবে, নিশ্চয়ই হবে।
|| অনীক || জুন ৫, ২০১৩ ||