স্থান কাল চেপে যাই।
পায়ে হেঁটে ক্যান্টনমেন্টে ঢুকছি। একজন মিলিটারি পুলিশ আমাকে আটকালেন। আইডি দেখতে চাইলেন। মানিব্যাগ খুলে ডেবিট কার্ডটা বের করলাম। উনি বললেন, যান!
কোন এক ব্যস্ত চৌমাথায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছি। আচানক একজন ট্রাফিক পুলিশ এসে বললেন, “এক্সকিউজ মি, আপনি কিসের ছবি তুলছেন?”
বললাম, এইতো, মানুষ, রাস্তা, গাড়ি, দালান, এইসব। বললেন, দেখান। বললুম, দ্যাখেন।
কয়েকটা শট দেখে বললেন, ঠিকাছে। জিজ্ঞেস করলাম, কোন সমস্যা? বললেন, না, এমনি।
খটকা লাগলো, সিকিউরিটি ইস্যুতে যদি ধরবে, তো পুলিশ ধরতো, ট্রাফিক পুলিশ আশা করিনি। ঘন্টা দুই পর মনে হলো, আচ্ছা, ট্রাফিক পুলিশরাও তো মাঝে মাঝে পেপারের ফার্স্ট পেইজে আসে রিকশাওয়ালার থেকে সেলামি নেবার স্থিরচিত্রে!
একবার রাত ৩টের দিকে একজন পুলিশ আমায় আটকেছিলেন, বিজয় সরণি ফ্লাইওভারে। বললেন, কই যান?
ফ্যাকলা হেসে বললাম, আংকেল, খুব সুন্দর চাঁদ উঠসে, জ্যোৎস্না দেখতে বের হইসি ![]()
আমার সৌভাগ্য ও আমি কৃতজ্ঞ, একটা বনকানা চটকানা দিয়ে উনি আমাকে খোয়াড়ে ভরেন নি।
“যান, বাসার ছাদে গিয়ে জ্যোৎস্না দ্যাখেন” বলে ফেরত পাঠিয়েছিলেন।
সেবারো রাত আড়াইটে মতো বাজে। আমি আর সংহতি হাতিরঝিলের বালির পাড়ে (তখন প্রোজেক্টের কাজ কেবল শুরু হয়েছে) দাঁড়িয়ে কোস্তাকুস্তি করছি। পাশে হিমেল দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। আকাশে চাঁদ, জোৎস্না জোৎস্না ভাব। এখানে সবিশেষ উল্লেখ্য যে, আমি তখন
৯২কেজি, সংহতি ৮২ আর হিমেল ১৩০+।
হঠাৎ গগণবিদারী বজ্রকণ্ঠ, “হ্যান্ডস আপ! “
মাথা ঘুরায়ে দেখি, চাঁদের আলোয় একটা পিস্তল ধরা হাত আমাদের দিকে তাক হয়ে আছে!!
ইন্নালিল্লাহ!! কাজী মারুফের কালোবন্দুকও চান্দের আলোয় এতো চকচক করেনা!!
বোধকরি, টহল পুলিশের লেগুনা আমাদের অতিকায় বপুসমুহের কোস্তাকুস্তির অভিরাম দৃশ্য নিতে পারে নাই। সোজা ধরে নিয়ে হলের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো।
কিংবা সেই ডিবি পুলিশেরা, যারা বলেছিলেন, যে তারা ভালো ডিবি, কিন্তু সব ডিবি ভালো না। তাদের সাদা মাইক্রোবাসে আটক একজন ভ্রাম্যমাণ পতিতা ও তার খদ্দের যিনি কিনা কোচিং সেন্টারে পড়ান, তার সাথে আমাদেরো সহ-খদ্দের বলে খুব সহজেই চালিয়ে দেয়া যায়! সম্মান বাঁচাতে তাদের যে কোন দাবী পূরণে আমরা ও আমাদের পরিবার বাধ্য থাকতো সেক্ষেত্রে।
কিন্তু তারা ভালো ডিবি, তাই আমরা ভাগ্যবান। এবং সব ডিবি ভালো না। তাই আমাদের ঘরে ফেরা উচিত!
সেই রাত চারটার বসুন্ধরা সিটির বিপরীত যাত্রী ছাউনিটায় আমাদের শুভানুধ্যায়ী সেই সব ভালো ডিবিদের কাছে আমি আজও কৃতজ্ঞ।
যখন কালসীর পরে সাগুফতা বলে কিছু ছিলো না, রাস্তায় মাটি ফেলা ট্রাক সার বেঁধে বালু ফেলে যায়, সেইখানে, যেখানে সেই রাত ২-৩টার দিকে কেউ আমাকে পুতে ফেলে চলে গেলেও আর কেউ কিচ্ছু টের পাবে না, সেখানে আমাকে একটুও বকা না দেয়া পুলিশ আংকেলটিকেও মাঝে মাঝে ভালোবাসা জানাতে ইচ্ছে হয়।
আমার প্রিয় নেশাগুলোর মধ্যে ছিলো, মাঝরাতের পর খোলা রাস্তায় ফাঁকা সড়কদ্বীপে একা বসে সিগ্রেট ধরানো। মাঝে মাঝে ভারী ট্রাক গোঙাতে গোঙাতে ছুটে যেত। টের পেতাম পথের কাঁপন। ট্রাফিক আলোর রঙ বদলে কিসের যেন ঈশারা পেতাম, কেমন যেন ঘোর লাগতো চোখে। প্রলাপের মত শোনাবে, হয়তো আমিও পাগল ছিলাম।
এখন, সত্যি কথা, রাতে বেরুতে ভয় পাই। এখন RAB জানে, খোঁড়া লিমনের চেয়ে মৃত লিমন অনেক নিরাপদ হতো। কাদেরের থ্যাতলানো শরীর হুমকি হলেও, নিখোঁজ-গুম কাদের কারো মাথা ব্যাথা হতো না।
খবরের কাগজে রোজ অমন বহু ক্রসফায়ার কিংবা বেওয়ারিশ লাশের খবর আসে। শিরোনামের বেশি পড়েই বা ক’জন?
বাইদ্যোয়ে, “রাষ্ট্র বনাম লিমন” লড়াইয়ের লিমনকে মনে থাকতেই পারে। “কাদের” নামটা ভুলে গেছেন নিশ্চয়ই? আব্দুল কাদের, প্রাণ রসায়ণ ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১১ সাল, জুলাই ১৫।
হুম, আমি ভাগ্যবান মানুষ।
শুভরাত্রি।